এক ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধার পেটে হঠাৎ ভয়ানক ব্যথা শুরু হলে পরিবারের লোকজন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তাররা এক্স-রে করার পর যা দেখলেন, তাতে তাঁদের নিঃশ্বাস থমকে গেল—বৃদ্ধার পেটে ছিল ৪০ বছর পুরনো একটি মৃত বাচ্চা, যা সময়ের সাথে সাথে পাথর হয়ে গেছে।
এই ঘটনাটিকে বিজ্ঞানীরা বলেন লিথোপিডিয়ন (Lithopedion) বা সাধারণভাবে স্টোন বেবি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি এক অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, ১৫৮২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে এরকম মাত্র ৩০০টির মতো কেস নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কোটি কোটি জন্মের ভিড়ে এটি প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা।
সাধারণত গর্ভাবস্থায় নিষিক্ত ডিম্বাণুটি জরায়ুর (Uterus) ভেতরে গিয়ে সংযুক্ত হয় এবং সেখানেই শিশুটি বড় হতে থাকে। কিন্তু কখনও কখনও নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব (Fallopian Tube) ব্লক থাকায় নিষিক্ত ডিম্বাণুটি জরায়ুতে পৌঁছাতে পারে না। তখন সেটি টিউবের ভেতরেই বেড়ে উঠতে শুরু করে, যাকে বলে একটোপিক প্রেগন্যান্সি (Ectopic Pregnancy)।
ফ্যালোপিয়ান টিউব শিশুকে ধারণ করার মতো জায়গা নয়, তাই টিউবটি ফেটে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রূণটি টিউব থেকে পিছলে পেটের ভেতর বা অ্যাবডোমেন (Abdomen)-এ চলে আসে। সেখানেই অল্প সময়ের জন্য সে বেড়ে উঠতে থাকে, কিন্তু যথেষ্ট পুষ্টি না পাওয়ায় মারা যায়।
যখন ভ্রূণটি মারা যায়, নারীর শরীর সেটিকে একটি মৃত টিস্যু (Dead Tissue) হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সংক্রমণ রোধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Immune System) সক্রিয় হয়। শরীর তখন ভ্রূণটিকে ঘিরে ক্যালসিয়ামের স্তর (Calcium Layer) তৈরি করতে থাকে, যেন কোনো জীবাণু বা পচন ছড়াতে না পারে। ধীরে ধীরে সেই মৃত ভ্রূণটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো রূপ নেয়।
এই প্রক্রিয়া এত ধীরে হয় যে, অনেক সময় মহিলারা বুঝতেই পারেন না তাঁদের শরীরে এমন কিছু ঘটছে। পেটে হালকা অস্বস্তি, ফুলে থাকা বা ব্যথাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। ফলে বছর পেরিয়ে যায়—কখনও দশকও।
যেমন এই ৮২ বছরের বৃদ্ধা। তিনি জানতেন না যে তাঁর শরীরের ভেতর একটি বাচ্চা—যে বাচ্চা হয়তো একদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে উঠতে পারত—সে এখন চার দশক ধরে পাথর হয়ে পড়ে আছে। ভাবা যায়? শরীরের ভেতর নিজের সন্তানের নিথর অবশেষ, অথচ তিনি জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়ে দিয়েছেন তা টের না পেয়েই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে এটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়ের বিষয়। কিন্তু একজন নারীর জীবনের দৃষ্টিতে এটি এক নীরব বেদনা। জীবনের এক সময় তিনি হয়তো আশা করেছিলেন মা হবেন, কিন্তু সেই আশার চিহ্নই আজ তাঁর শরীরে পাথর হয়ে লুকিয়ে আছে।
আজকের আধুনিক যুগেও কিছু জায়গায় নারীরা নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করেন না। বিশেষত গ্রামীণ বা দরিদ্র এলাকায় যেখানে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত, সেখানেই এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বেশি। প্রাথমিক পর্যায়ে একটোপিক প্রেগন্যান্সি শনাক্ত হলে অস্ত্রোপচার করে সহজেই তা ঠিক করা যায়। কিন্তু দেরি হলে বিপদ বাড়ে।
চিকিৎসা যত উন্নতই হোক, এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শরীরের ছোট্ট অসুস্থতাকেও অবহেলা করা ঠিক নয়। হয়তো তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এমন এক রহস্য, যা সময়ের সাথে পাথর হয়ে যায়—অবাক করে, কাঁদিয়ে দেয়, আর জীবনকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
সূত্র: ফেসবুক