এনআরএস মেডিকেল কলেজের একজন ব্রিলিয়ান্ট ডাক্তার আজ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দক্ষিণ কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হ্যাঁ, দক্ষিণ কলকাতার নাকতলা, রামগড় কিংবা বাঘাজতিনের অলিতে গলিতে উভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন একজন মানুষ যার অগোছালো চুল, লম্বা এলোমেলো দাড়ি, মলিন পোশাক আপনাকে বুঝতেই দেবে না এই মানুষটাই একটা সময় ছিলেন একজন নামকরা কার্ডিয়াক সার্জেন।
এতদিন অবশ্য পথচলতি মানুষ তাকে দেখে পাশ কাটিয়ে যেত, কেউ বা মুখ ঘুরিয়ে নিত, কেউ আবার দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। কিন্তু এই মানুষটার হাতেই যখন কেউ একটা খাতা-পেন তুলে দিত, ঠিক তখনই এই মানুষটার মুখে জ্বলে উঠতো আলো। সাদা কাগজের পাতায় রোগের নাম শুনেই একের পর এক ওষুধের নাম, ডোজ, ইনজেকশন সবকিছুই যেন নিখুঁতভাবে লিখে দিত। মানুষটা শুধু তাই নয়, একটা গোটা প্রেসক্রিপশন লেখার পর তার একেবারে শেষ প্রান্তে লিখে দিত "ডক্টর সৌরভ ঘোষ"। তার সঙ্গেই থাকতো ডিগ্রি আর একটা রেজিস্ট্রেশন নাম্বার।
এই হৃদয় বিদারক ঘটনা ঠিক কীভাবে নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের মেধাবী ছাত্র আজ একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরেতে পরিণত হল।
উনিশো সাতানব্বই সালে দক্ষিণ কলকাতার নাততলা হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন সৌরভ ঘোষ। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন সৌরভ। এনআরএস মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়বার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি এরপর দুহাজার তিন সালে সেখান থেকে এমবিবিএস পাশ করে চিকিৎসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সৌরভ দক্ষিণ কলকাতার একটা মধ্যবিত্ত পরিবারেই বেড়ে ওঠা সৌরভের বাবা রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন, পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রাইভেট টিউটার। পাড়া প্রতিবেশীদের কথায় ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র এবং বাধ্য ছাত্র ছিলেন সৌরভ। সৌরভরা ছিলেন তিন ভাইবোন এক দিদি,সৌরভ নিজে,একটি ছোট ভাই।
কিন্তু কেউ কখনো ঘনঘরও ভাবতে পারেনি এমন একটা শিক্ষিত ভদ্র পরিবারের ভাগ্যই এমন ভয়ংকর অভিশপ্ত। তো খুব অল্প বয়স থেকেই এই তিন ভাইবোনের মধ্যে মানসিক সমস্যা লক্ষ্যণ দেখা দিতে শুরু করে। সৌরভের দিদি সাথীয ও ডাক্তারি পাশ করেছিলেন কিন্তু মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কয়েক বছর আগেই তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।
তবে এখানেই শেষ নয়, সৌরভের ছোটো ভাই গৌরব যিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন তিনিও একইভাবে মানসিক অসুস্থতায় ভেঙে পড়েন এবং অকালে মৃত্যু বরন করেন। যদিও দুই সন্তানের এই মর্মান্তিক পরিণতি দেখার আগেই সৌরভের বাবা-মা দুজনেই প্রয়াত হন। আর এই নিদারুণ শোকটাই কাটিয়ে উঠতে পারেননি সৌরভ। খুব স্বাভাবিক ভাবে পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষ চলে যাওয়ার পর সৌরভ সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছিলেন।
যে মানুষটা একা সময়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর শপথ নিয়ে চিকিৎসক হয়েছিলেন, সময়ের নিস্তুর আঘাতে সেই মানুষটা এধীরে এধীরে তলিয়ে গেছিলেন গভীর মানসিক অবসাদে। আর এভাবে এই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরভ নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। নিজের বাড়ির একদম নিচতলার একটা অন্ধকার অপরিচ্ছন্ন ঘরেই তিনি নিজেকে প্রায় বন্দি করে রেখেছিলেন। সেই ঘরের দেওয়ালগুলোই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। আর আশ্চর্যভাবে সেই দেওয়াল জুড়ে তিনি লিখে গেছেন নিজের পরিচয়। কোথাও লেখা নিজের নাম, কোথাও ডিগ্রি, কোথাও আবার মেডিকেল রেজিস্ট্রেশন নাম্বার।
কোনো দেওয়ালে চোখে পড়তো এনআরএস মেডিকেল কলেজ, আবার কোনো দেওয়ালে সিএমসি ভেলোর, আবার কোথাও কেপিসি মেডিকেল কলেজ। এই যেন নিজের অস্তিত্ব আঁকড়ে ধরে রাখার এক মরিয়া চেষ্টা।
এই সময় অবশ্য সৌরভের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার প্রতিবেশীরা। তারাই তিনবেলা সৌরভের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তিন তিনবার বাড়ি ছেড়ে উধাও হয়ে গেছিলেন সৌরভ। যদিও এলাকার মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী সৌরভ মানসিক ভারসাম্য হারালেও ডাক্তার সৌরভ কোথাও হারিয়ে যাননি। যদি কেউ তাকে কখনো কোনো রোগের কথা বলতো, তৎক্ষণাতমাত্র দুএক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি নির্ভুলভাবে সেই রোগের ওষুধ সাজেস্ট করে দিতেন। অনেকে আবার এও জানিয়েছেন, সেই ওষুধে নাকি বহু মানুষই উপকৃত হয়েছেন। বর্তমানে অবশ্য সৌরভের পাশে তার মেডিকেল কলেজের বন্ধুরা এসে দাঁড়িয়েছেন এবং তাকে এই মুহূর্তে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে।
জীবন কি অদ্ভুত, তাই না? যে মানুষটা হয়তো আজ সুস্থ সবলভাবে গোটা পরিবারকে নিয়ে একটা ভালো জীবন কাটানোর কথা, আজ সেই মানুষটাই সর্বস্বান্ত হয়ে সম্পূর্ণ একা জীবনযুদ্ধের লড়ছেন।
আসলে জীবন কাকে কখন কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়, আমরা সত্যিই কেউ জানি না। তাই যতদিন সুস্থ আছেন, নিজের বেঁচে থাকাকে রোজ উদযাপন করুন।
আর হ্যাঁ, মানসিক অসুস্থতাকে কখনো অগ্রাহ্য করবেন না। শরীরের মতোই আমাদের মনেরও কিন্তু চিকিৎসা প্রয়োজন।